×

পেলিং (Pelling) ডায়েরি: এক অসমাপ্ত যাত্রা ও কিছু অমলিন স্মৃতি

Kanchenjungha

২৩ শে ফেব্রুয়ারি, সোমবার  

সকাল থেকেই টানটান উত্তেজনা। অবশেষে এসে গেছে সেই দিন যেদিন আমরা দার্জিলিং মেইল করে রওনা দেব পেলিঙ-এর (Pelling) উদ্দেশ্যে। সকালেই পৌঁছে গেলাম নোয়াপাড়ায়, আমার শ্বশুরবাড়িতে, সবাই তখন শেষ মুহূর্তের গোছানোতে ব্যস্ত। 

যাই হোক, সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা নাগাদ উবের বুক করে রওনা দিলাম শিয়ালদা স্টেশনের উদ্দেশ্যে। পৌঁছতে সময় লাগল ঠিক এক ঘন্টা। দার্জিলিং মেইল ছাড়ার সময় ছিল রাত ১০.১৫। কিন্তু ছাড়তে ছাড়তে বেজে গেল রাত ১০.২৪।  

যেহেতু সারা রাতের ট্রেন, মজা হয়েছিল খুব। কেউই তেমন ঘুমোতে পারিনি, কুঝিকঝিক সঙ্গে সহযাত্রীদের ফিসফাস ও নাসিকা গর্জন সব মিলিয়ে ট্রেন জার্নিটা ছিল জমজমাট।  ধীরে ধীরে ভোরের সূর্য দর্শন দিলেন, আর আমরা কাঁচের জানলার ওপার থেকে দেখলাম ছোট ছোট চায়ের বাগান আর কুয়াশায় ঘিরে থাকা অপার্থিব সৌন্দর্যকে। 

২৪ শে ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার

সকাল তখন প্রায় ৮টা বেজে ৩০ মিনিট, আমাদের ট্রেন তখন তার নির্দিষ্ট গন্তব্য নিউ জলপাইগুড়িতে পৌঁছে গেছে। স্টেশনে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল নাসিব ছেত্রী, আমাদের ড্রাইভার দাদা। আগামী ৩দিন তিনি ও তার সহকারী আরেক ড্রাইভার দাদা আমাদের পেলিং ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন। 

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য Phamalhakhang eco-homestay -এর দূরত্ব প্রায় পাঁচ ঘন্টার। তাই সকালের জল খাবার সারতে আমরা পৌঁছে গেলাম Chaasum রেস্টুরেন্টে।  খুব সুন্দর করে সাজানো গোছানো রেস্টুরেন্ট, সেখানে আমরা খেলাম আলুর পরোটা ও তরকারি।  তৃপ্তি করে ভরপেট খেয়ে আমরা সবাই আবার গাড়িতে চেপে বসলাম। অসংখ্য চড়াই উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে দুপুর আড়াইটে নাগাদ হোমস্টের দর্শন পেলাম এবং যাহা দেখিলাম তাহা জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না! 

সামনেই কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতমালা, উন্মুক্ত নীলাকাশ ও ছোট্ট এক ফালি সবুজ ঘাসের গালিচা। তার পাশেই রাত প্রহরীর ন্যায় দাঁড়িয়ে কাঠের বাড়ি যা আমাদের আগামী দুইদিনের ঠিকানা।  আর তার ঠিক সামনেই হাসিমুখে দাঁড়িয়ে সঙ্গীতা, হোমস্টের মালিক। 

দুপুরবেলা যেহেতু পেটে কোনো দানাপানি পরে নি, তাই আমাদের অনুরোধে ম্যাগি, পকোড়া ও ধোঁয়া ওঠা গরম চা পাঠিয়ে দিল।  সারা রাস্তার জার্নিতে শরীর খুবই ক্লান্ত ছিল, তাই খাওয়া দাওয়া করে একটু ঘুমিয়ে নিলাম। পাহাড়ি অঞ্চলে রাত নামে একদম ঝপ করে, সেই কনকনে হাওয়ায় গায়ে সোয়েটার চাপিয়ে আমরা সংগীতাদের ঘরে পৌঁছে গেলাম রাতের খাওয়া দাওয়া সারতে। মেনু ছিল খুব সাধারণ কিন্তু তার স্বাদ ছিল এক কথায় অসাধারন।  ওনাদের বাগানের রাই শাক, সাদা গরম ভাত, নিরামিষ তরকারি, ও ঘরে তৈরী আচার খেয়ে আমাদের চোখ তখন ঢুলু ঢুলু।  

২৫শে ফেব্রুয়ারি, বুধবার 

ঘুম ভাঙল ভোর সাড়ে চারটার সময়, আস্তে আস্তে দেখা দিচ্ছেন বহু প্রতীক্ষিত কাঞ্চনজঙ্ঘা। সময় তখন সকাল পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটা, ধীরে ধীরে কুয়াশার ঘন আবরণ সরে গিয়ে আবির্ভুত হলেন স্বর্ণালী পর্বতমালা। সূর্যালোকের উজ্জ্বল ছটায় তিনি হয়ে উঠলেন মনমোহিনী! নির্মিমেশ নয়নে তার রূপ অবলোকন করতে করতে ঘড়ি দেখি, সকাল তখন ৯টা বেজে ৩০ মিনিট। 

সকালের ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম কাঞ্চনজঙ্ঘা ফলস, রিম্বি ফলস, রিম্বি অরেঞ্জ গার্ডেন ও Khecheopalri Lake বা খেচুপেরি লেক দেখতে।  যেহেতু শীত কাল, তাই রিম্বি জলপ্রপাত দেখতে অনেকটা সরু জলের ধারার বেশি কিছুই লাগছিল না।  

এর পরে পৌঁছে গেলাম রিম্বি অরেঞ্জ গার্ডেনে। যেদিকে চোখ যায় থোকা থোকা কমলালেবু ঝুলছে গাছ থেকে। যদিও কেউ ভুল করেও কমলালেবু পাড়তে যেও না, অন্যথায় জরিমানা দিতে হবে ৫০০ টাকা।  কমলা লেবুর গাছের মধ্যে দিয়ে সরু সুতোর মত রাস্তা দিয়ে নামতে নামতে পৌঁছে গেলাম ছোট্ট জলাশয়ের কাছে।  শান্ত ও নিস্তরঙ্গ। ফেরার পথে আমরা কিনলাম এক প্যাকেট আখরোট, বাশ ও এক নাম না জানা ফুলের আচার, প্রত্যেকটির দাম ৫০ টাকা।  

কিন্তু যেখানে গিয়ে আমরা সবাই বাক্যিহারা হয়ে গেলাম তা হল কাঞ্চনজঙ্ঘা জলপ্রপাত। অবিরাম জলের ধারা পাথরের বড় বড় চাঁইয়ের উপর পড়ছে ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ করে।  সেই জলপ্রপাতের অবিরাম ধারায় চারিদিকে বৃষ্টির মত জল ছিটকে পড়ছে, সে এক অনবদ্য অনুভূতি। সেখানে সবাই একসঙ্গে ছবি তুলে চলে গেলাম খেচুপেরি লেকে। অনেকটা পাথরের বাঁধানো রাস্তা পেরিয়ে আমরা অবশেষে পৌঁছে গেলাম লেকের ধরে, শান্ত, নিস্তব্ধ, সকল কোলাহলতার ঊর্ধ্বে সাক্ষ্য দিচ্ছে এক প্রাচীন জনপদ ও ইতিহাসের উত্তরসূরি হয়ে।  

পথেই এক রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে বিকেলের মধ্যে পৌঁছে গেলাম হোমস্টে। বিকেলের জলখাবারের মেনু ছিল রায় শাকের পকোড়া ও সুগন্ধি চা ও রাতের মেনু ছিল রাই শাক, এক রকম ফলের আচার, আলু ভাজা, তরকারি, মুরগি কষা।  

dinner at homestay

২৬শে ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার

আজকের গন্তব্য ছিল চেনরেজিগ বুদ্ধ স্ট্যাচু, স্কাইওয়াক, সিডকিওঙ টুলুক বার্ড পার্ক (Chenrezig statue, skywalk, SIDKEONG TULUK BIRD PARK). এগুলো নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই।  বুদ্ধ মূর্তির বিশালতা, স্কাই ওয়াকের উচ্চতা, আর বার্ড পার্কের বিচিত্রতা মনকে মুগ্ধ করে তোলে। 

বুদ্ধ মূর্তি শুধুই মূর্তি নয়, তার ভিতরে একটা মন্দির আছে, আর সেখানে অপূর্ব সব হাতে আঁকা চিত্র। ভিতরে ক্যামেরা নিয়ে ছবি তোলা বারণ তাই কোনো ছবি তুলতে পারি নি।  চিত্রগুলিতে বিভিন্নরকম গল্পকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, খুঁটিয়ে দেখলে হিন্দু ধর্মের কিছু প্রভাব তাতে লক্ষ্যণীয়।  

স্কাইওয়াক থেকে খুব সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশের ছবি তোলা যাবে যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে।  এত কিছুর মধ্যে একটা জিনিস খারাপ লাগছিল যে আজকাল মানুষ এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে যে শুধুই নিজের ছবি তুলতে ব্যস্ত।  কোথাও জায়গাটা ঘুরে ঘুরে দেখবে, উপভোগ করবে, সেসবের কোনো বালাই নেই।      

এরপরে রোপওয়ে চড়লাম, যদিও দারুন উত্তেজক কিছু মনে হয় নি।  আমার কাছে মোটামুটি লেগেছে। এমন কিছু উপর দিয়ে যাচ্ছিল না।  উপরন্তু কুয়াশার কারণে পরিষ্কার সবকিছু দেখাও যাচ্ছিল না। কিন্তু আমাদের বেশ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছিল কারণ আমরা যখন স্কাইওয়াকে হাঁটছিলাম, তখন থেকে বারবার ভূমিকম্প হচ্ছিল।  তাই ওরা সব যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে নিচ্ছিল যে ঠিক আছে কিনা। 

যাইহোক তারপরে ওখানেই একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাওয়াদাওয়া করে নিলাম, মেনুতে ছিল চিকেন ফ্রায়েড রাইস, মোমো ও কোলা। সেখান থেকে আমরা সোজা চলে এলাম বার্ড পার্কে।  সাধারণত চিড়িয়াখানায় দেখা যায় যে পশুপাখি খাঁচার মধ্যে বন্ধ, আমরা মানুষেরা বাইরে থেকে তাদের দেখছি। কিন্তু এখানে তা পুরোপুরি উল্টো। 

একটি সুবিশাল খাঁচার ভিতরে অসংখ্য নাম না জানি পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছে, বসে আছে, দানাপানি খাচ্ছে, দড়ির উপর দোল খাচ্ছে, আর সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় এই যে আমরাও সেই খাঁচার ভিতরে ঢুকে তাদের দেখতে পারছি। তারা আমাদের চারপাশ দিয়ে হেঁটে চলেছে, খাবার খাচ্ছে, আর আমরা তা উপভোগ করছি। অপূর্ব সেই মুহূর্তগুলো।  কোথা দিয়ে যে সময় কেটে গেল কিছুই বুঝতে পারলাম না।  

ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার ভূমিকম্প হয়ে গেছে। আমরা ভীষণ ভয় পেয়ে গেছি।  কি করব বুঝতে পারছি না। যাই হোক আমরা হোমস্টেতে ফিরে এসে রাতের খাবার খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম কারণ পরেরদিন আবার বেড়ানোর আছে।  মাঝ রাতে বিশাল ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে গেল, দেখলাম বিছানা কাঁপছে।  আমি ও আমার স্বামী পরস্পরকে জড়িয়ে বসেছিলাম যতক্ষণ না বন্ধ হল।  

তখন ই পরিবারের সকলে মিলে ঠিক করল আর একদিন ও পেলিঙে নয়, আমরা কলকাতা ফিরে আসব। কারণ যেভাবে ভূমিকম্প হচ্ছে তাতে যদি ধস নামে, আমরা আটক পরে যেতে পারি। অগত্যা পরেরদিন পেলিং এ ঘুরতে যাওয়া মুলতুবি রেখে আমরা বাগডোগরার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম ও সন্ধ্যা ৬টার বিমানে কলকাতা রওনা দিলাম।  

একটু মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে শুরুটা যতটা সুন্দর হয়েছিল, শেষটা অসম্পূর্ন থেকে গেল।  কিন্ত এটা ভুললে চলবে না যে জীবন অনিশ্চিত, সবকিছুই আমাদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা।  এটা ঠিক যে এই ভ্রমণ থেকে বেশ কিছু ঘুরতে যাওয়ার জায়গার নাম কাটা গেল, কিন্তু যা পেলাম তা অবর্ণনীয়।  

শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেকটি মানুষকে নতুনভাবে চিনলাম, জানলাম। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরো মজবুত হল।  আর যার কথা না বললেই নয় সে হল আমার পরম প্রিয় টুকু, আমার ভাসুর ঠাকুরের ছেলে।  ১৫ বছর বয়স, কিন্তু এত বুদ্ধিদীপ্ত ও পরিণত মনস্ক, যে ওকে ভালো না বেসে থাকা যায় না। এটাই ছিল আমার প্রথম শ্বশুরবাড়ির মানুষজনের সঙ্গে কোথাও দূরে ঘুরতে যাওয়া।  এবং তা এত ভালো লেগেছে যে আমি প্রতি বছর ওদের সঙ্গে ঘুরতে যেতে চাই।    

এক নজরে তথ্যাবলী 

টিকিটের মূল্য:

  • রোপওয়ে প্রতি জন – ৩০০ টাকা 
  • খেচুপেরি  লেক – ৩০ টাকা ও পার্কিং ফি ২০ টাকা 
  • বার্ড পার্ক – জন প্রতি ১০০ টাকা ও পার্কিং ফি – ৩০ টাকা 
  • Chassum রেস্টুরেন্ট – যাওয়ার সময় ১১৯৭ টাকা ও ফেরার পথে ৩১২৮ টাকা।  
  • Phamlhakhang Eco Homestay- সাতজনের (তিনটে রুম) ব্রেকফাস্ট ও দিনার মিলিয়ে ৪ দিনের মোট ৪০,৩০০ টাকা।  (সিজন বিশেষে দাম পরিবর্তিত হতে পারে )

পরিকল্পিত ভ্রমণসূচী

প্রথম দিন 

  1. Kanchenjunga Falls—1 hr 26 min by car from Pelling City 
  2. Khecheopalri Lake—1 hr 24 minute by car (north)
  3. Rimbi waterfalls—51 minutes by car from Pelling city (north).
  4. Rimbi Orange Garden—54 minutes by car (near waterfalls)

MAP—https://maps.app.goo.gl/ANjz7T42yuJA8qe47 

দ্বিতীয় দিন 

  1. Sky Walk Pelling Sikkim – 36 minute by car (south)
  2. Cherzing Buddha statue—36 minutes by car (near skywalk) (south)—the distance between these two is one minute by car
  3. Sanghak Choeling Monastery— 34 minutes by car (south) distance 2 minute from sky walk

MAP –https://maps.app.goo.gl/Ki7fwapyBZgKfCiW7 

তৃতীয় দিন 

  1. Pemayangtse Monastery, – 33 minutes by car (south)
  2. Sidkeong Bird Park—32 minutes by car (south) distance 4 minute by car from Pemayangtse
  3. Rabdentse Ruins—33 minutes by car from Pelling City (south) distance 4 minutes by car from Pemayangtse

MAP – https://maps.app.goo.gl/PwtB4sNfQbi4JsdU8 


কিছু হোমস্টের তালিকা –

  1. The Phamlhakhang Ecohomestay
  2. Yonzon lha dhim
  1. Lamthang Retreat (upper pelling)
  1. The Nettle & Fern Farm Stay, Pelling
  1. Tripoo Rhisum the Haapo retreat
  1. GRAND VIEW HOMESTAY
  1. Adhikari Homestay

Hello! I'm Oindrila, and I'm 32 years old. I live in Madhyamgram with my husband, Swarna, who truly is the most amazing person. Our marriage and our home are everything to me. I always say that family is my absolute lifeline; it’s the foundation of everything I do. When I’m not spending time with them, I’m busy channeling my creative energy. I love to cook, especially trying out new recipes. I also spend a lot of time doing traditional Kantha embroidery, which is deeply relaxing. Writing is another passion—I love to capture my life experiences in stories and express my inner world through poems. And, of course, I always look forward to our next chance to travel!

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

কিছু ভুলে গেলে নাতো দেখতে?