এক খাপছাড়া শীতের অলস দিনে

| সময় | বিশেষ মুহূর্ত |
| ভোর ৬টা – সকাল ৮টা | ৯ ডিগ্রি তাপমাত্রা, কুয়াশা আর রান্নাবান্নার ব্যস্ততা। |
| সকাল ৮টা – ১০টা | অফিস না যাওয়ার সিদ্ধান্ত এবং লেপের তলায় আয়েশ। |
| সকাল ১০টা – দুপুর ১টা | প্রফেসর শঙ্কু, রবীন্দ্রসংগীত আর স্বর্গীয় অনুভূতি। |
| দুপুর ১টা – বিকেল ৫টা | ভাতের গুষ্টি উদ্ধার, হরিয়ানা থেকে বাবার ফোন আর দুধ-চা ও নিমকি। |
| সন্ধ্যা ৬টা | রাতের রুটি-তড়কা আর তাজা কাতলা মাছ ভাজার পরিকল্পনা। |
ভোর ৬টা
মোবাইলে দেখাচ্ছে বাইরে তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রচন্ড কুয়াশায় চারিদিক থৈথৈ করছে। কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছে না। প্রতিদিনের মত আজকেও সকালে প্রায় ৬টা নাগাদ অ্যালার্ম ঘড়ির বিশ্রী টিকটিক শব্দে ঘুম গেল ভেঙে।
সকাল সাতটা
উঠে পরে দৈনন্দিন কাজে লেগে গেলাম। আজকের মেনু ছিল সকালে পরোটা ও সাদা আলুর তরকারি আর দুপুরে লাল শাক, ডাল, সর্ষে ফুলের বড়া, ও বিট ভাজা। রান্নাবান্না শেষ করতে করতে প্রায় পৌনে আটটা বেজে গেল।
সকাল আটটা
আমি প্রায় প্রতিদিন এই সময়ে বাসি জামাকাপড় ছেড়ে অফিসের ফর্মাল জামা পরে বেরিয়ে যাই। মোবাইলে তখনও দেখছি তাপমাত্রা প্রায় দশের কাছাকাছি। সূয্যি মামার দেখা নেই। কি মনে হল ঠিক করলাম আজ এই শীতের অলস দিনে অফিস যাবো না। আমায় দেখে আমার বরবাবাজীও তার যাবতীয় পরিকল্পনা শিকেয় তুলে লেপের তলায় সুরুৎ করে ঢুকে গেলেন। অগত্যা কিং কর্তব্য, লেপ ই ভরসা।
সকাল নয়টা

সকাল প্রায় নয়টা। এরই মধ্যে আমাদের গৃহসহায়িকা দেখা দিলেন। ঘরের যাবতীয় ঝাড়াপোঁছা করে, বাসন মেজে তিনি বিদায় নিলেন। আমি কিছুক্ষণ মটকা মেরে লেপের তলায় পরে রইলাম। কিছুক্ষণ পর থালায় বেড়ে নিয়ে এলাম পরোটা ও সাদা আলুর তরকারি, দুজনে বসে বসে অনেকক্ষণ হাত চাটলাম।
সকাল দশটা

হটাৎই আমার দৃষ্টিপথে উদিত হলেন প্রফেসর শঙ্কুর মোটা বইখানা। আমি লেপের তলায় পা ঢুকিয়ে অনেকদিন পর আবার আয়েশ করে বই পড়া শুরু করলাম। এরই মধ্যে স্বর্ণ মানে বরবাবাজি স্পিকারে হালকা করে রবীন্দ্রসংগীত চালিয়ে দিলেন। মনে পরে গেল সেই কবি আমীর খসরুর সেই বিখ্যাত উক্তি – “পৃথিবীতে যদি স্বর্গ থাকে, তবে তা এখানেই, এখানেই, এখানেই।”
দুপুর একটা

ঘন্টাখানেক কথা দিয়ে কেটে গেল কিছুই বুঝলাম না। আমি তখন ডুবে আছি শঙ্কু আর বাগদাদের সেই আশ্চর্য বাক্সের গোলকধাঁধায়। পেটের ভিতরে ছুঁচো বাবাজির দৌঁড়াদৌড়িতে বুঝলাম দুপুর একটা বেজে ১৫ মিনিট।


অগত্যা দুই পেটুক থালা সাজিয়ে ভাতের গুষ্টি উদ্ধার করতে বসলাম। একে একে শাক, ডাল, ও বড়া আমাদের পেটের ভিতরে অন্তর্হিত হল, পরে রইল শুধু চকচকে থালাখানি।
দুপুর আড়াইটে
এবার ভাতঘুমের পালা। ছোটবেলায় যেমন নতুন বইয়ের আঘ্রানে সর্বসুখ খুঁজে পেতাম, এখন ঘরের মধ্যে টুকটুক করে ঘোরাঘুরি করে, দুপুড়ে ভরপেট খাবার খেয়ে ভাতঘুমের মধ্যে সেই সুখ আবার খুঁজে পেলাম।
দুপুর পৌনে তিনটে

কিন্তু বিধি বাম। একটু চোখ লেগেছে কি লাগে নি, ক্রিং ক্রিং। ফোনের ঘন্টি জানান দিল বাবা ফোন করেছে সেই সুদূর হরিয়ানা থেকে। বাবা মা এখন হরিয়ানাতে দাদার কাছে। শুরু হল দুজনের রোজকার অভিযোগের ফিরিস্তি। সেই শুনতে শুনতে ঘুম ‘চল টাটা’ বলে পিঠটান দিল। অগত্যা, কি করি, দুজনকেই বাচ্ছাদের মত ভুলিয়ে ভালিয়ে ফোন রেখে দিলাম।
বিকেল পাঁচটা
তারপর কিছুক্ষণ আবার প্রফেসর শঙ্কু পড়ার পর দেখলাম এখন বাজে বিকেল পাঁচটা। চলে এলাম রান্না ঘরে, বানিয়ে ফেললাম এক পেয়ালা গরমাগরম চা। ধোঁয়া ওঠা দুধ চায়ের সঙ্গে গঙ্গানগর হাটে কেনা কুচো নিমকি ভাজা। এর স্বাদই আলাদা।
মাঝে মাঝে ভাবি আমার জীবনটা এই খাবারকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। বাইরে যত পরিশ্রমই হোক না কেন, ঘরে এসে রান্না করার সঙ্গে সঙ্গে সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। আমার মতে, তোমাদের কারোর যদি Anxiety থাকে, এবং কি করবে বুঝতে পারছ না, রান্না করো (যদি ভালোবাসো তবেই), দেখবে Anxiety বাপ বাপ বলে পালাচ্ছে।
সন্ধ্যা ছয়টা
আজ রাতের জন্য রান্না করা আছে, তড়কা। শুধু গরম গরম রুটি বানিয়ে নেওয়ার অপেক্ষা। অবশ্য আজ কথা আছে গঙ্গানগর থেকে তাজা কাতলা মাছ নিয়ে আসার। আজ দুটো মাছের পেটি ভাজা খাবো আর বাকি সব ঝোলে রান্না করব। তাহলে কালকে দুপুরের জন্য নিশ্চিন্ত।
আজ এই পর্যন্তই। আবার কোনো এক বিকেলে চলে আসব আমার জীবনের কথকতা নিয়ে তোমাদের সঙ্গে একান্তে আড্ডা দিতে। ভালো থেকো, ভালো রেখো।


Post Comment