×

আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা যাওয়ার কথা ভাবছেন? পড়ুন আমার এই অভিজ্ঞতা

Kolkata Book fair 2026

তারিখ: ২৪শে জানুয়ারি, ২০২৬

স্থান: সেন্ট্রাল পার্ক মেলা প্রাঙ্গণ (করুণাময়ী), কলকাতা

যাবো কি যাবো না?

দিনটি ছিল ২৪শে  জানুয়ারির সকাল, আগের দিন সরস্বতী পুজোর রেশ তখনও বাতাসে ভাসছে। ঠিক হল বইমেলা যাব।  আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা (International Kolkata Book Fair), শুরু হয়েছে ২২ শে  জানুয়ারি। নির্ঘন্ট বেলা ১২টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত।  অতএব শনিবার দিন সকাল সকাল প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে দিলাম। আলমারি থেকে বের হল চওড়া লাল পাড় ঘিয়ে রঙের শাড়ি। বইমেলা যে, শাড়ি না পড়লে চলে! পৌঁছতে পৌঁছতে বেশ বেলা হয়ে গেল।  

সেন্ট্রাল পার্ক বইমেলা প্রাঙ্গনে যখন পৌছালাম, তখন সূর্য পশ্চিমদিকে ঢলতে শুরু করেছে।  বেলা প্রায় একটা।  বইমেলা ঢোকার প্রায় ৯টি গেট আছে।  আমরা নয় সংখ্যক বহির্দ্বার দিয়ে মেলা প্রাঙ্গনে ঢুকে পড়লাম।  শুরু হলো মেটাল ডিটেক্টরের তল্লাশি। তত্বাবধানে ছিলেন রাজ্য পুলিশ কর্মীরা।  

সেই বাধা ডিঙোতে না ডিঙোতেই পড়লাম তো পর একদম সমুদ্রে – সারি সারি বইয়ের দোকান।  যেইদিকে তাকাচ্ছি সেইদিকে দোকান। প্রথমেই আমরা আমাদের মুঠোফোনে ম্যাপ খুললাম কোন দোকান কোথায় রয়েছে ও আমরা কোন দিকে যাবো।  তাতে কিছুটা সুবিধে হল বৈকি।  আমরা কিছুটা ধারণা পেয়ে গেলাম।

পরামর্শ: শুরুতেই ফোনে ম্যাপটা দেখে নেওয়া খুব জরুরি। সেন্ট্রাল পার্কের গোলকধাঁধায় কোন স্টল কোথায়, তা ম্যাপ ছাড়া বোঝা মুশকিল।

কলকাতা বইমেলা ২০২৬অখ্যাত স্টলেই কি লুকিয়ে থাকে অমূল্য রতন?

প্রথমেই শুরু করলাম ছোট দোকান গুলো দিয়ে।  এবার ঠিক করেই রেখেছিলাম যে কোনো বড় বইয়ের দোকানে যাবো না।  অখ্যাত, অনামা প্রকাশনায় এত ভালো ভালো বই পাওয়া যায় যা ভাবা যায় না।  ওই একটা কথা আছে না যে “যেখানে দেখিবে চাই, উড়াইয়া দেখো তাই, মিলিলেও মিলিতে পারে অমূল্য রতন।“ 

খুঁজতে খুঁজতে হটাৎই চোখ আটকে গেল এক বইয়ের প্রচ্ছদে – শ্মশান।  বেশ অভিনব বিষয়।  এর পরে একের পর এক বই কেনা শুরু হল।  বলে রাখা ভালো যে আমরা প্শনি ও রবি পরপর দুই দিন বইমেলা গিয়েছিলাম। প্রায় ২৩টি বই আমাদের সংগ্রহে এসেছে – অবশ্যই পকেট গড়ের মাঠে পরিণত হয়েছে।  কিন্তু তাতে কোনো দুঃখ নেই।  এবার মনের আশ মিটিয়ে বই কিনেছি।  

যাইহোক, মূল কথায় ফেরত আসি।  আমার এই অভ্যাসটা বড় বাজে।  খালি ধান ভানতে শিবের গীত শুরু করি।  যা বলছিলাম একে একে কিনে ফেললাম –         .

  • বাংলার সংস্কৃতি : লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায় – নারায়ণ সামাট 
  • নির্বাচিত লেখকের একশো প্রিয় গল্প – সম্পাদনায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় 
  • এবং আমরা – সম্প্রদায় সংখ্যা 
  • প্রাচীন ভারতে নারী ও সমাজ – সুকুমারী ভট্টাচার্য 
  • গ্রীম ভাইদের রূপকথা অমনিবাস
  • রেড ইন্ডিয়ানদের রূপকথা – অনুবাদে পল্লব সেনগুপ্ত 
  • নির্বাচিত ভুতের গল্প – সম্পাদনায় সিদ্ধার্থ সিংহ 
  • পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী লোককথা – দিব্যজ্যোতি মজুমদার 
  • হাজার এক রান্না সমগ্র 
  • সেরা কিশোর উপন্যাস
  • যৌন পূজা – মানস ভান্ডারী 
  • শ্মশান মিথ পুরান ইতিহাস – অলোক সরকার 
  • সুনির্বাচিত প্রিয় গল্প- শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় 
  • সস্তা ওষুধ দামি ওষুধ, ভালো ওষুধ মন্দ ওষুধ – ড: সিদ্ধার্থ গুপ্ত 
  •  মোল্লা নাসিরুদ্দিন ও তেনালিরামনের সেরা গল্পের বাহার।  
  • বন্দে আলী মিয়ার রূপকথা সমগ্র
  • নারী – হুমায়ুন আজাদ 
  • দেখি আল্পনার ডালি 
  • বাংলার দেবতা, অপদেবতা ও লোকদেবতা – মৃগাঙ্ক চক্রবর্তী 
  • চিকিৎসা ও অপচিকিৎসা – ড: পার্থসারথি গুপ্ত 
  • সেকালের কলিকাতার যৌনাচার – মানস ভান্ডারী 
  • প্রাগিতিহাস – মধুশ্রী বন্দ্যেপাধ্যায় 

পেটপুজো নাকি বিড়ম্বনা?

শুধু যে বই কিনেছি তা নয়, পেটপুজো সমান তালে চলেছে।  হরিণঘাটা মাংসের দোকান থেকে খরগোশ ও কোয়েল (QUAIL) পাখি ভাজা।খেতে খুব একটা আহামরি নয়।  এত মশলা মাখা ছিল যে মাংসের আসল স্বাদ-ই পাই নি।  যাইহোক তারপরে লোভে পরে একটা ‘বিরিয়ানি দুজনে মিলে ভাগ করে খেলাম কিন্তু অতীব জঘন্য।  

যাই হোক, খেতে বসে ধৈর্য ধরতে না পেরে হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’ বইটি পড়া শুরু করে দিলাম।দীর্ঘ প্রায় চার বছর নিষিদ্ধ থাকার পর বইটি পুনরায় প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে বইটি থেকে পড়া কয়েক লাইন তুলে দিচ্ছি – “কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, ক্রমশ নারী হয়ে ওঠে।  ………. অধিকাংশ ভাষায় মানুষ বা মানুষজাতি বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয় যেসব শব্দ, সেগুলো পুরুষ বোঝায়। ম্যান বা ম্যানকাইন্ড পুরুষবাচক। …… বাংলায় মানুষ, লোক পুরুষ বোঝায় না বলে মনে হতে পারে; কিন্তু মেয়েমানুষ, মেয়েলোক বললে বোঝা যায় আপাতলিঙ্গবাদী বাংলা ভাষাও লিঙ্গবাদী, পুরুষতন্ত্রের প্রতাপ এতেও প্রচন্ড।”

বাতাসে গুনগুন, লেগেছে ফাগুন…..

এখানে সম্পূর্ণ একটা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলতে খুব ইচ্ছা করছে।  বইমেলা আমার কাছে খুব খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুটি – এক, অনেক ছোটবেলায়, প্রায় বছর পাঁচেক বয়স যখন বাবা মায়ের হাত ধরে বইমেলা গিয়েছিলাম।এটা তখনের কথা বলছি যখন বইমেলা ময়দানের মাঠে বসত।  সেই প্রথম আমার রংবেরংয়ের বই কেনা শুরু।আর দ্বিতীয়ত, প্রায় সাত বছর আগে ২০১৯ এর বইমেলায় স্বর্ণর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। আমাদের ভালোবাসা রং পেয়েছিল এই বইমেলার হাত ধরেই।   

কীভাবে কলকাতা বইমেলা যাবো? (বইমেলা যাতায়াত গাইড)

যদি তুমি বারাসাত লাইনে থাকো, তাহলে DN-47 ধরে সোজা করুণাময়ী বাস স্ট্যান্ড চলে যাবে।  আর যদি বাস না পাও তবে সোজা এক নম্বর এয়ারপোর্ট চলে আসবে যেকোনো বাস বা অটো ধরে, তারপর সেখান থেকে করুণাময়ী যাবার প্রচুর বাস পেয়ে যাবে। বাস স্ট্যান্ড থেকে নেমেই বইমেলা প্রাঙ্গন শুরু হচ্ছে।  তোমাকে কষ্ট করে খুঁজতে হবে না। বাস থেকে নামলেই তুমি বইমেলার দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে।  

কি কি ভালো লেগেছে?

সকলেই বলে আজকালকার ছেলেমেয়েরা নাকি বই ভালোবাসে না। কথাটায় আমি মোটেও বিশ্বাস করি না।  প্রচুর ছেলেমেয়ে এসেছিল বইয়ের খোঁজে, এক ঝাঁক মৌমাছির মত।  বইয়ের দাম হাতের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া সত্ত্বেও বইয়ের দোকানের সামনে ছিল মানুষের লম্বা লাইন।  মানুষ বই কিনছে, বই হাতড়াচ্ছে, নতুন পাতার গন্ধ শুঁকছে, পুরোনো বইয়ের দোকানে খুঁজে চলেছে অমূল্য রত্নের সন্ধান।  বই কিনুক বা না কিনুক, কলকাতা বইমেলা মানুষের কাছে এক উৎসব, এ এক আবেগের অনন্যসাধারণ বহিৰ্প্ৰকাশ।  

এই প্রসঙ্গে একটি অভিজ্ঞতা তোমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।  নারায়ন বইয়ের স্টলে আমরা ঢুকেছিলাম। দোকানটি পুরোনো বইয়ে ঠাসা – মোপাসাঁ অনুবাদ থেকে শুরু করে পরশুরাম সমগ্র সবই আছে কিন্তু পুরোনো প্রকাশনা।  বিক্রেতা দাদা আমাদের বেশ কিছু বইয়ের সন্ধান দিল, আমাদের সঙ্গে সঙ্গে তিনিও অন্যধরণের  বই খুঁজে দিচ্ছিলেন এই আশায় যে আমাদেরও সেইসব বই ভালো লাগবে।  

যখন আমরা বেশ কিছু বই কিনলাম, দাদা আমাদের একটি বই বিনামূল্যে উপহার দিলেন। এইসকল অনুভূতির কোনো মূল্য হয় না।  যখন ধন্যবাদ জানাতে গেলাম, স্মিতহাসি হেসে দাদা বললেন “ না না ধন্যবাদের কি আছে, আপনারা বই ভালোবাসেন।” 

এই মুহূর্তগুলো সাক্ষী যখন মনে হয় সত্যি, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ, যখন মানুষকে আরও ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।  এইবারে আরো একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি যে বই কিনি বা না কিনি, প্রকাশক দাদারা নিজেরাই হাসি মুখে বইয়ের ক্যাটালগ দিচ্ছিলেন, বইয়ের ছবি তুলতে দিচ্ছিলেন। বিরক্তির ছায়ামাত্র ছিল না সেই পরিশ্রান্ত চোখেমুখে। 

সতর্কতা (ভুল করেও এই ভুল নয়!)

আমরা যারা পুরোনো বইয়ের মন কেমন করা গন্ধে ডুবে যেতে ভালোবাসি, তাদের জন্য আমার এই ছোট্ট পরামর্শ বা অনুরোধ। বইমেলায় বেশ কিছু পুরোনো বইয়ের দোকান চোখে পড়বে।  বেশ কিছু ভালো ভালো বই চোখে পড়বে কিন্তু যেই দরদাম করতে যাবে, বুঝতে পারবে সাক্ষাৎ ডাকাতের হাতে পড়েছ! এখন মা কালীই ভরসা।  নতুন বইয়েরও দ্বিগুন মূল্য হাঁকছে, ছয়শো।. নয়শো….. হাজার।  আমরাও সেই ফাঁদে পড়েছিলাম, অবশেষে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ঘরে ফিরলাম।

 শেষ হয়েও হইল না শেষ!

মনে পরে সেই গান – “মন-পাহাড়ের কোলে বরফ/তোর পরশে গলে” – ‘ক্যাকটাস’ ব্যান্ডের গান।  আমার বড় প্রিয়।  বই হচ্ছে সেই বঁধূ যার পরশে আমাদের হিম শীতল শুষ্কতা দ্রবীভূত হয়ে ওঠে।  দরকার নেই কোনো সার্জিকাল মাস্কের-এই ধুলো ভরা মাঠ, বইয়ের গন্ধ, খাবারের টান, সর্বোপরি, মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস বেঁচে থাকুক বছরে পর বছর ধরে।  আবারো আসব কলকাতা বইমেলা, ঘুরে দেখবো তোমার আনাচে কানাচে।সাক্ষী থাকুক কপোলের স্বেদবিন্দু, দুপুরের মিঠে রোদ, প্যাকেটভর্তি জল, বইয়ের ছেঁড়া পাতা, আর ধুলোয় ভরা মাঠের হাওয়া।   


Hello! I'm Oindrila, and I'm 32 years old. I live in Madhyamgram with my husband, Swarna, who truly is the most amazing person. Our marriage and our home are everything to me. I always say that family is my absolute lifeline; it’s the foundation of everything I do. When I’m not spending time with them, I’m busy channeling my creative energy. I love to cook, especially trying out new recipes. I also spend a lot of time doing traditional Kantha embroidery, which is deeply relaxing. Writing is another passion—I love to capture my life experiences in stories and express my inner world through poems. And, of course, I always look forward to our next chance to travel!

Post Comment

কিছু ভুলে গেলে নাতো দেখতে?